মেয়েদের জন্য হরমোন ব্যালেন্স বজায় রাখা এবং ফিটনেস অর্জনের জন্য নিয়মিত ব্যায়াম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। মাসিক চক্রের বিভিন্ন পর্যায়ে হরমোনের পরিবর্তনের কারণে শরীরের শক্তি ও মেজাজ ভিন্ন হয়। তাই মাসিক চক্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ব্যায়াম রুটিন তৈরি করলে শরীর ও মন দুটোই সুস্থ থাকে। এই ৭ দিনের ব্যায়াম পরিকল্পনা বাঙালি জীবনযাত্রার সঙ্গে মানানসই এবং ঘরে করা যায়। ব্যায়াম শুরু করার আগে ডাক্তার বা ফিটনেস বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন, বিশেষ করে যদি মাসিক চক্রে সমস্যা বা অন্য কোনো স্বাস্থ্য সমস্যা থাকে।
মাসিক চক্রের পর্যায় ও ব্যায়াম
মাসিক চক্র সাধারণত ২৮ দিনের হয়, যা চারটি পর্যায়ে বিভক্ত:
-
মাসিক পর্যায় (১-৫ দিন): হরমোনের মাত্রা কম থাকে, শরীর ক্লান্ত লাগতে পারে। হালকা ব্যায়াম উপযুক্ত।
-
ফলিকুলার পর্যায় (৬-১৪ দিন): এস্ট্রোজেন বাড়ে, শক্তি বেশি থাকে। তীব্র ব্যায়াম করা যায়।
-
ওভুলেশন পর্যায় (১৪-১৬ দিন): শক্তি সর্বোচ্চ থাকে। শক্তিশালী ব্যায়ামের জন্য উপযুক্ত।
-
লিউটিয়াল পর্যায় (১৭-২৮ দিন): প্রোজেস্টেরন বাড়ে, শরীর কিছুটা ক্লান্ত লাগতে পারে। মাঝারি ব্যায়াম ভালো।
নিচের রুটিনটি এক সপ্তাহের জন্য তৈরি করা হয়েছে, যা মাসিক চক্রের বিভিন্ন পর্যায়ের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া যায়।
দৈনিক ব্যায়াম রুটিন (৭ দিন)
প্রতিদিনের প্রস্তুতি
-
উষ্ণতা বাড়ান (Warm-up, ৫-৭ মিনিট): হালকা জগিং, জাম্পিং জ্যাক বা হাই নিস করুন। এটি পেশি গরম করবে এবং ইনজুরির ঝুঁকি কমাবে।
-
প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম: কোনো সরঞ্জাম লাগবে না। শুধু একটি ম্যাট বা কার্পেট, আরামদায়ক পোশাক এবং পানির বোতল রাখুন।
-
পানি পান: ব্যায়ামের আগে, সময় এবং পরে পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
দিন ১: হালকা ব্যায়াম (মাসিক পর্যায়)
লক্ষ্য: শরীরকে বিশ্রাম দিয়ে হালকা নড়াচড়া।
ব্যায়াম (২০-২৫ মিনিট):
-
হাঁটা (Walking) – ১৫ মিনিট (ঘরে বা বাইরে)।
-
কোমর ঘোরানো (Waist Rotations) – ১ মিনিট (ঘড়ির কাঁটার দিকে এবং বিপরীতে)।
-
শিশু ভঙ্গি (Child’s Pose) – ১ মিনিট (২ সেট)।
-
ক্যাট-কাউ স্ট্রেচ (Cat-Cow Stretch) – ১ মিনিট (২ সেট)।
শেষে (৫ মিনিট): গভীর শ্বাসের ব্যায়াম এবং হালকা স্ট্রেচিং।
উপকার: মাসিকের সময় ব্যথা ও ক্লান্তি কমায়, হরমোন ব্যালেন্সে সাহায্য করে।
দিন ২: মাঝারি কার্ডিও (ফলিকুলার পর্যায়)
লক্ষ্য: শক্তি বাড়ানো এবং হরমোনের ভারসাম্য।
ব্যায়াম (৩০ মিনিট):
-
জাম্পিং জ্যাক (Jumping Jacks) – ১ মিনিট (৩ সেট, ৩০ সেকেন্ড বিশ্রাম)।
-
স্কোয়াট (Squats) – ১৫ বার (৩ সেট)।
-
প্ল্যাঙ্ক (Plank) – ২০ সেকেন্ড (৩ সেট)।
-
হাই নিস (High Knees) – ৩০ সেকেন্ড (৩ সেট)।
শেষে (৫ মিনিট): হালকা যোগা (যেমন কোবরা ভঙ্গি বা Cobra Pose)।
উপকার: এস্ট্রোজেন বৃদ্ধির সঙ্গে শক্তি বাড়ায় এবং চর্বি পোড়ায়।
দিন ৩: তীব্র ব্যায়াম (ফলিকুলার/ওভুলেশন পর্যায়)
লক্ষ্য: শক্তি ও পেশি শক্তিশালী করা।
ব্যায়াম (৩০ মিনিট):
-
বার্পি (Burpees) – ১০ বার (৩ সেট)।
-
পুশ-আপ (Push-ups) – ১০ বার (৩ সেট, হাঁটুতে ভর দিয়ে করা যায়)।
-
বাইসাইকেল ক্রাঞ্চ (Bicycle Crunches) – ১৫ বার (৩ সেট)।
-
মাউন্টেন ক্লাইম্বার (Mountain Climbers) – ৩০ সেকেন্ড (৩ সেট)।
শেষে (৫ মিনিট): গভীর শ্বাস এবং কোমরের স্ট্রেচিং।
উপকার: হরমোনের উচ্চ মাত্রায় শরীরের স্ট্যামিনা বাড়ায়।
দিন ৪: কোর ও ফ্লেক্সিবিলিটি (ওভুলেশন পর্যায়)
লক্ষ্য: পেটের পেশি শক্ত করা ও নমনীয়তা বাড়ানো।
ব্যায়াম (৩০ মিনিট):
-
প্ল্যাঙ্ক – ৩০ সেকেন্ড (৩ সেট)।
-
রাশিয়ান টুইস্ট (Russian Twists) – ২০ বার (৩ সেট)।
-
লেগ রেইজ (Leg Raises) – ১৫ বার (৩ সেট)।
-
সাইড প্ল্যাঙ্ক (Side Plank) – ২০ সেকেন্ড প্রতি পাশে (২ সেট)।
শেষে (৫ মিনিট): যোগা (যেমন শিশু ভঙ্গি বা Child’s Pose)।
উপকার: পেটের চর্বি কমায় এবং হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখে।
দিন ৫: মাঝারি কার্ডিও (লিউটিয়াল পর্যায়)
লক্ষ্য: শক্তি বজায় রাখা এবং হরমোনের পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া।
ব্যায়াম (৩০ মিনিট):
-
স্পট জগিং (Spot Jogging) – ২ মিনিট (৩ সেট)।
-
ক্রাঞ্চ (Crunches) – ১৫ বার (৩ সেট)।
-
স্কোয়াট – ১৫ বার (৩ সেট)।
-
হাই নিস – ৩০ সেকেন্ড (৩ সেট)।
শেষে (৫ মিনিট): হালকা স্ট্রেচিং এবং গভীর শ্বাস।
উপকার: প্রোজেস্টেরনের বৃদ্ধির সময় শরীরকে সক্রিয় রাখে।
দিন ৬: হালকা ব্যায়াম ও যোগা (লিউটিয়াল পর্যায়)
লক্ষ্য: শরীর ও মনকে শান্ত রাখা।
ব্যায়াম (২০-২৫ মিনিট):
-
হাঁটা – ১৫ মিনিট।
-
ক্যাট-কাউ স্ট্রেচ – ১ মিনিট (২ সেট)।
-
শিশু ভঙ্গি – ১ মিনিট (২ সেট)।
-
প্রজাপতি ভঙ্গি (Butterfly Pose) – ১ মিনিট (২ সেট)।
শেষে (৫ মিনিট): ধ্যান বা গভীর শ্বাসের ব্যায়াম।
উপকার: মানসিক চাপ কমায় এবং হরমোন ব্যালেন্সে সাহায্য করে।
দিন ৭: বিশ্রাম বা হালকা নড়াচড়া
লক্ষ্য: শরীরকে বিশ্রাম দেওয়া এবং পুনরুদ্ধার।
-
হালকা হাঁটা: ১৫-২০ মিনিট (ঘরে বা বাইরে)।
-
যোগা: ১০ মিনিট (যেমন শবাসন বা Corpse Pose)।
-
গভীর শ্বাস: ৫ মিনিট ধ্যান।
উপকার: পেশি পুনরুদ্ধারে সাহায্য করে এবং পরবর্তী চক্রের জন্য প্রস্তুত করে।
গুরুত্বপূর্ণ টিপস
-
খাদ্যাভ্যাস: হরমোন ব্যালেন্সের জন্য পুষ্টিকর খাবার খান।
-
প্রোটিন: ডিম, মাছ, মুরগি, ডাল।
-
ফাইবার: সবুজ শাকসবজি, ব্রাউন রাইস, ওটস।
-
স্বাস্থ্যকর ফ্যাট: বাদাম, অলিভ অয়েল, অ্যাভোকাডো।
-
এড়িয়ে চলুন: চিনি, ফাস্ট ফুড, প্রক্রিয়াজাত খাবার।
-
-
পানি পান: দিনে ৮-১০ গ্লাস পানি পান করুন।
-
ঘুম: প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমান। ঘুম হরমোন নিয়ন্ত্রণে সহায়ক।
-
মানসিক চাপ: ধ্যান, যোগা বা হালকা শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম মানসিক চাপ কমায়।
-
মাসিক সমস্যা: যদি মাসিকের সময় ব্যথা বা অনিয়ম থাকে, তীব্র ব্যায়াম এড়িয়ে হালকা যোগা করুন।
এই মাসিক ব্যায়াম রুটিন নিয়মিত অনুসরণ করলে হরমোনের ভারসাম্য বজায় থাকবে, শরীর ফিট থাকবে এবং মানসিক স্বাস্থ্য ভালো হবে। নিজের শরীরের সংকেত শুনে ব্যায়ামের তীব্রতা সামঞ্জস্য করুন এবং সুস্থ থাকুন!